টিনটিন – সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুদিত কমিকস

The Adventure of Tintin বা দুঃসাহসী টিনটিন হল বেলজিও কার্টুনিস্ট হার্জের রচিত কমিক্স সিরিজ। টিনটিন একজন প্রতিবেদক এবং অভিযাত্রী যে তার কুকুর স্নোয়ির সাথে সারা পৃথিবী ভ্রমন করেন। ১৯২৯ সালে ল্য ভাঁতিয়েম সিয়েকল নামক একটি বেলজিয়ান সংবাদপত্রের ল্য প্যতি ভাঁতিয়েম নামক সাপ্তাহিক যুব ক্রোডপত্রের মাধ্যমে সর্বপ্রথম এই সিরিজের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ধারাবাহিকভাবে মোট চব্বিশটি অ্যালবামে প্রকাশিত এই সিরিজটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। টিনটিনকে নিয়ে একটি সফল পত্রিকা প্রকাশিত হয়। টিনটিনের গল্প অবলম্বনে চলচিত্র ও নাটকও নির্মাণ হয়। মোট ৫০ টিরও বেশী ভাষায় অনূদিত এই সিরিজের বইয়ের কপি বিক্রির সংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই সিরিজের প্রধান চরিত্র টিনটিন একজন ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী বালক যার গোল মুখমণ্ডল আর কপালের ওপর আঁচড়ে তোলা চুলের জন্য তাকে সহজেই চেনা যায়। টিনটিন তীক্ষ্ণবুদ্ধির অধিকারী, আত্মরক্ষা করতে সক্ষম, সৎ, ভদ্র এবং সহানুভূতিশীল। সে তার তদন্তমূলক সাংবাদিকতা, দ্রুত চিন্তার মাধ্যমে সবসময় রহস্য সমাধান করে থাকে। কমিকসের অন্যান্য বর্ণিল চরিত্রের বিপরীতে টিনটিন নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ফলে কমিকসের পাঠক নিজেকে টিনটিন হিসেবে কল্পনা করে নিতে পারে। টিনটিনের স্রষ্টা ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করলেও তার সৃষ্টি এখনও টিকে আছে এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে জনপ্রিয় সাহিত্যিক চরিত্র হিসেবে। টিনটিনের অভিযান নিয়ে ২০১১ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রথমদিকে বর্ণবৈষম্য, কমিউনিজম বিদ্বেষ বা এ জাতীয় কারণে সমালোচিত হলেও টিনটিন তার “অসাধারণ প্রাণশক্তি”র জন্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। এমনকি অনেক গবেষক কেবল টিনটিন-চর্চায় তাদের কর্মজীবন ব্যয় করেছেন। ফরাসী জেনারেল চার্লস দ্য গল বলেছিলেন, তার “একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দী হলো টিনটিন”। হার্জে টিনটিনকে ১৪-১৫ বছর বয়সী একজন শ্বেতাঙ্গ বেলজিয়ান বালক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অ্যাসউলিন টিনটিনকে মধ্যবিত্ত বালক বলে গণ্য করেছেন যার একাধিক বৈশিষ্ট্য হার্জের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। প্রথম আবির্ভাবে টিনটিন একটি দীর্ঘ ভ্রমন কোট ও টুপি পরিহিত থাকলেও পরবর্তীতে প্লাস ফোরস (বিশেষ ধরনের পাজামা), চেকের স্যুট, কালো মোজা ও ইটন কলারের মাধ্যমে তার পোশাকে পরিবর্তন আনা হয়। এখানে উল্লেখ্য, এর মাধ্যমে হার্জে তার কলেজের এক কানাডিয় ছাত্রের কথা স্মরন করিয়ে দেয় যে প্লাস ফোরস আর অর্গাইল মোজা পরিধানের জন্য উত্তক্তের স্বীকার হয়৷ পরবর্তীতে যখন তিনি তার তৃতীয় অভিযানের জন্য শিকাগোতে আসেন তখন হার্জে টিনটিনের চেহারা এবং পোশাকে আরও কিছু পরিবর্তন আনেন। একবার এক সাক্ষাৎকারে হার্জকে জিজ্ঞেসা করা হয় যে টিনটিনের চরিত্রটি কিভাবে বিকশিত করা হয়েছে? তিনি উত্তর দেন “তিনি কার্যত বিবর্তিত নয়। গ্রাফিক্যালি তিনি একটি রূপরেখা আঁকেন। তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো দেখুন, তাঁর মুখটি একটি সূত্র।” এই দৃশটি অ্যাসাউলিনের দ্বারা প্রতিধ্বনিত হয় যে গ্রাফিকালি টিনটিন ছিল “গল্পের লাইনের মত অসম্পূর্ণ।” টিনটিন তাঁর প্রথম অভিযান থেকেই তিনি একজন রিপোর্টারের চরিত্রে ছিলেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে তিনি রিপোর্টিং এর কাজ করেন। তবে তাঁর বিভিন্ন অভিযানের জন্য তাঁকে যতটানা রিপোর্টারের ভূমিকায় দেখা যায় তার থেকে বেশী তাঁকে গোয়েন্দার ভূমিকাতেই দেখা যায়। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, গভীরভাবে দেখার চোখ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার জন্য তাঁকে শার্লক হোমসের সাথেও তুলনা করা হয়। শুরু থেকেই টিনটিন মোটরসাইকেল, এরোপ্লেন, ট্যাঙ্কসহ যে কোন যান্ত্রিক গাড়ি চালানো ও ঠিক করার জন্য দক্ষ ছিল, এমনকি সে খুব সহজে মোটরগাড়িও চালাতে পারতো। সে মোর্স কোডে দক্ষ একজন রেডিও অপারেটর ছিল। প্রয়োজনে ভিলেনের মুখে মুষ্টাঘাত করতে এবং চিত্তাকর্ষক সাঁতার প্রদর্শনেও সে দক্ষ ছিল। চন্দ্রাভিযানের সময় সে নিজেকে একজন দক্ষ প্রকৌশলী ও চিকিৎসক প্রমান করেন। তিনি একজন চমৎকার ক্রীড়াবিদও, যে কোন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দূরততে হাঁটতে, দৌড়াতে বা সাঁতার কাটতে সক্ষম। যে কোন কিছু থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার এক অপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী সে। মোট কথা টিনটিন একজন অল রাউন্ডার যার জন্য হার্জ নিজেও তাঁকে পছন্দ করতেন৷

Share:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

0

TOP

Call

X