পাগলাটে ভ্যান গগ ও তার অমর স্টারি নাইট

চিত্রশিল্পের ইতিহাসে অনন্য সাধারণ এক নাম ভিনসেন্ট ভ্যান গগ। আর এই অনন্য সাধারণ শিল্পীর অসাধারণ এক সৃষ্টি হচ্ছে ‘দ্যা স্টারি নাইট’। ভিনসেন্ট ভ্যান গগ তার জীবনকালের প্রায় শেষের দিকে এই ছবিটি এঁকেছিলেন। এই ছবিটা আকার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি আত্মহত্যার মাধ্যমে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন। তার জন্ম ১৮৫৭ সালের হল্যান্ড এর এক ছোট্ট গ্রামে।

‘দ্যা স্টারি নাইট’ ভিনসেন্ট ভ্যান গগের তৈলচিত্র গুলোর মধ্যে অন্যতম। এই পুরো ছবিটাই তিনি তেল রঙে এঁকেছিলেন। এই ছবিটা তিনি ১৮৮৯ সালের জুন মাসে সম্পূর্ণ করেছিলেন। ১৯৪১ সাল থেকে এই ছবিটি নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অফ আর্ট এর স্থায়ী সম্পত্তি হিসেবে আছে।

আমরা যদি দ্যা স্টারি নাইট ছবিটির ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো এই ছবিটির ইতিহাস কিন্তু বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। সেই সাথে কিছুটা বিষণ্ণও বটে। ভিনসেন্ট ভ্যান গগ এই ছবিটি কিন্তু তার বাসায় কিংবা স্টুডিওতে বসে আকেননি। তিনি এই ছবিটা এঁকেছিলেন একটি মেন্টাল এসাইলামে থাকার সময়। ভিনসেন্ট ভ্যান গগের মেন্টাল এসাইলামে ভর্তি হবার পেছনের কারণটিও কিন্তু বেশ অদ্ভুত। আসলে ১৮৮৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বর এক সহকর্মীর সাথে বচসায় লিপ্ত হয়ে ভ্যান গগ রাগের মাথায় নিজেই নিজের বাম কান কেটে ফেলেন (পরে তিনি এই কানের টুকরো একজন যৌনকর্মীকে উপহার দেন)।  এজন্য এই ঘটনার পর পরই ভ্যান গগ নিজ ইচ্ছায় সেইন্ট পল ডি মস্যল এসাইলামে ভর্তি হন ১৮৮৯ সালের মে মাসে। একজন জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী হবার সুবাদে এই এসাইলামে ভ্যান গগ অন্যান্য রোগীদের থেকে একটু বেশিই সুবিধা পেয়েছিলেন। তাকে শুধু দোতলায় একটি সুন্দর ঘরই দেয়া হয়নি, সেই সাথে তাকে ছবি আকার জন্য নিচ তলায় একটা স্টুডিও দেয়া হয়েছিল।

এইবার আসি সেই জনপ্রিয় ছবি ‘দ্যা স্টারি নাইট’ এর কথায়। বলা হয়ে থাকে ভিনসেন্ট ভ্যান গগ মেন্টাল এসাইলামের যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের পশ্চিম জানালার দৃশ্যপট থেকেই তিনি ‘দ্যা স্টারি নাইট’ ছবিটি এঁকেছিলেন। মেন্টাল এসাইলামে থাকার সময়ে তিনি তার ভাই এর কাছে বেশ কিছু চিঠি লিখেছিলেন। সেসব চিঠি গুলোতে তিনি তার জানালা থেকে দেখা দিন ও রাতের সৌন্দর্য বর্ণনা করেছিলেন। এই বর্ণনার সাথে ‘দ্যা স্টারি নাইট’ ছবিটির প্রচুর মিল রয়েছে। ‘দ্যা স্টারি নাইট’ ছবিটিতে আমরা মূলত একটি গ্রামের উপর রাতের আকাশ দেখতে পাই, যেখানে এগারোটি তারা অগ্নি গোলকের মত ঘুরপাক খেতে দেখা যায়। সেই সাথে একটি বাতাসে দুলতে থাকা সাইপ্রাস গাছ, জ্বলজ্বলে একটা চাঁদ, মেঘময় নীলচে আকাশ আর বেশ স্পষ্টভাবেই একটা টাওয়ার দেখতে পাওয়া যায়। এই সব কিছুর সাথেই ভিনসেন্ট ভ্যান গগের চিঠিতে বর্ণনা করা বিভিন্ন দৃশ্যপটের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

মগটি অর্ডার করতে ছবিতে ক্লিক করুন

তবে মেন্টাল এসাইলামে ঘরে বসে রঙ তুলি ব্যবহার করার অনুমতি ভ্যান গগের ছিল না। তিনি শুধু মাত্র নিচতলায় তার স্টুডিওতে বসেই রঙ তুলি ব্যবহার করে ছবি আকার অনুমতি পেয়েছিলেন। এজন্য রাতের বেশির ভাগ সময় তিনি কাগজের উপর পেন্সিল ব্যবহার করে ছবি আঁকতেন। এরপর দিনের বেলায় স্টুডিওতে গিয়ে ক্যানভাসে রঙ তুলি ব্যবহার করে সেই ভাবনা গুলোকেই ফুটিয়ে তুলতেন। বলা হয়ে থাকে যে ‘দ্যা স্টারি নাইট আকার আগে ভ্যান গগ প্রায় ২১টার মত রাফ ছবি এঁকেছিলেন। তারপরেও তার মনে হত তিনি এই ছবিটাতে তার কল্পনাকে সম্পূর্ণ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। এজন্য তিনি বিশ্ববিখ্যাত এই ছবিটাকে তার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

‘দ্যা স্টারি নাইট’ ছবিটি শেষ করার কিছু সময়কাল পরেই ভিনসেন্ট ভ্যান গগ আত্মহত্যা করেন। তার ছবি আকার সময়কাল খুবই কম ছিল। মাত্র দশ থেকে বারো বছর। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। তিনি তার মৃত্যুর সময় তার ভাইয়ের কাছে প্রায় ৮০০ ক্যানভাসে আকা ছবি আর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কাগজে আকা ড্রয়িং রেখে যান।এসব জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে ‘দ্যা স্টারি নাইট’ ছাড়াও আরও আছে ‘সেলফ প্রোট্রেট অফ ভিনসেন্ট ভ্যান গগ’, ‘সানফ্লাওয়ারস’, ‘ক্যাফে টেরেস এট নাইট’, ‘হুইট ফিল্ড উইথ সাইপ্রাসেস’ ইত্যাদি।

চলুন দেখা যাক এই ছবিটির জনপ্রিয়তার কিছু নমুনা।

  

লেখকঃ সাদিয়া রিফাত ইসলাম

Share:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

0

TOP

Call

X